মনপুরা

প্রকৃতি সেজে আছে অপরূপ সৌন্দর্যে

খোলা আকাশ, চারিদিকে খোলা বাতাস আর সামনে মুক্ত পথ। দক্ষিণ-পশ্চিমে মেঘনা নদীর বিশাল জলরাশি। নদীর সীমানা ঘেঁষে নদীর বুকেই জেগে উঠেছে চর। সেখানের প্রকৃতি সেজে আছে অপরূপ সৌন্দর্যে।

নদী আর খালের মোহনা যেখানে মিশে একাকার, সেখানে ট্রলার থামে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ নেমে পড়েন চরের উর্বর ভূখণ্ডে। বাধাহীন চরের পথে পথে হাঁটেন তাঁরা। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে খুঁজে পান সবুজের মায়ায় ঘেরা প্রকৃতি, খালে মাছ শিকারের দৃশ্য, অতিথি পাখিদের মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর খেলা, মহিষ চারণের বাথান কিংবা চরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা খালের দৃশ্য।

খালের ভেতর দিয়ে ট্রলারযোগে যেতে পারলে আরো বেশি ভালো লাগবে। কেউ বা আরো গভীরে গিয়ে খোঁজার চেষ্টা করেন চরের মানুষের জীবন প্রকৃতি। ইট-পাথরের বিশাল অট্টালিকা গড়ার সামর্থ্য না থাকলেও এসব মানুষ খড়কুটো দিয়ে দ্বিতলা ঘরে বাস করেন। জলোচ্ছ্বাসের ছোবল থেকে রক্ষা পেতে এমন শৈল্পিক কৌশল বেছে নিয়েছেন তাঁরা।

এমন বৈচিত্র্যময় স্থানটির নাম চর শামছুদ্দিন। চর শামছুদ্দিন উপকূলবর্তী লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়নের মেঘনা নদীতে জেগে ওঠে বহু বছর আগে। নদীর ওপারেই একটি বড় বাজার মতিরহাট। মতিরহাট জেলার প্রধান একটি বাণিজ্যিক জোন।

যেখানে বৃহত্তর নোয়াখালীর সবচেয়ে বড় ইলিশ ঘাটটি অবস্থিত। পাশে মতিরহাটের মেঘনাতীরে রয়েছে বিশাল বেলাভূমি। সেখান থেকে চর শামছুদ্দিনের দূরত্ব ট্রলারযোগে পাঁচ মিনিটের, যার কারণে চর শামছুদ্দিনে ভ্রমণপিপাসুদের বেশ সমাগম চোখে পড়ে। জেলার মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষ চর শামছুদ্দিনে ঘুরতে যায়।

ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে চেপে এখানকার নয়নাভিরাম প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসুরা চরের মানুষের জীবন ও রাখালের গরু-মহিষের বাথান চরানোর দৃশ্য উপভোগ করতে পারে। স্বাভাবিক সময়েও চরের মানুষের অস্বাভাবিক জীবন দেখলে আপনি হয়তো অবাকও হতে পারেন। কিন্তু চরের মানুষগুলো এ স্বাভাবিক জীবনধারায় অভ্যস্ত।

প্রতিনিয়ত দুর্যোগ-দুর্বিপাক, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আতঙ্কে বসবাস এসব মানুষের। প্রায় দুই দশক আগে মেঘনার বুকে চরটি জেগে ওঠে। দ্বীপের খুব কাছেই কমলনগরের চর কালকিনির একটি গ্রামের নাম থেকে চর শামছুদ্দিনের নামকরণ হয়। মতিরহাটের কাছেই অবস্থিত বলে এটি ‘মতিরহাটের চর’ নামেই মানুষের মুখে বেশ পরিচিত।

বর্ষায় চরটিতে ধান চাষ আর শুষ্ক মৌসুমে প্রধানত সয়াবিন, মরিচ চাষ হয়। আর চারপাশে নদী হওয়ায় মাছ শিকারিদেরও বসবাস চর শামছুদ্দিনে। বর্ষায় দ্বীপের মানুষের বিশুদ্ধ পানির তেমন সংকট না হলেও শুষ্ক মৌসুমে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট চরের মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তোলে।

বর্ষায় চর শামছুদ্দিনের আসল চেহারা ফুটে ওঠে। তখন চর শামছুদ্দিনে গ্রামবাংলার চিরায়ত দৃশ্য চোখে পড়ে। সবুজে মোড়ানো প্রাণছোঁয়া প্রকৃতি চেয়ে থাকে পুরো চর। দেখতে পাবেন কৃষকের ফসলের চাষাবাদ, জেলেদের মাছ শিকার কিংবা মহিষের বাথান। শত শত মহিষ চারণের দৃশ্য দেখলে আপনি হয়তো অবাকই হবেন।

শীতকালে চরের প্রকৃতিতে দেখা যায় অতিথি পাখিদের উচ্ছ্বাস। অতিথি পাখিদের ওড়াউড়ি নির্দ্বিধায় আপনার মনকে প্রশান্তি দেবে। আরো দেখতে পাবেন চরে খড় দিয়ে তৈরি মানুষের বসতঘর। দেখতে পাবেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানান রূপ।

চরটি জেগে ওঠার শুরুতে এখানে মানুষের তেমন বসতি ছিল না। চারদিক ছিল শুধুই মরুভূমির। ধীরে ধীরে চরের পরিবেশ অনুকূলে আসার কারণে মানুষ ভাবছিল, চরে বসবাস করার চিন্তা। এরপর নদীভাঙা এবং ভূমিহীন মানুষ বসবাস শুরু করে। বিভিন্ন স্থান থেকে নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে বসতি স্থাপন করা মানুষের সংখ্যাও কম নয়।

বর্তমানে এই চরে ২৫টি পরিবারের চার শতাধিকেরও বেশি মানুষের বসবাস। তাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা দেড় শতাধিক। ঈদ কিংবা বিভিন্ন উৎসব ছাড়াও এই চরে বিভিন্ন সময়ে পর্যটকদের পদচারণা লক্ষ করা যায়। চরে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির দেখা মেলে। বর্ষায় চরের প্রকৃতি হয়ে ওঠে অনিন্দ্যসুন্দর।

তাই এ সময়টা প্রকৃতিপিয়াসু মানুষের কাছে বেশ উপভোগ্য। শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, বৃহত্তর নোয়াখালীর মধ্যে এটি ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম তীর্থস্থান বলা চলে। ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে চর শামছুদ্দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে চরের এপারে, অর্থাৎ মতিরহাট মেঘনাতীরের ভূমিকা রয়েছে।

বিশাল বেলাভূমি নিয়ে সৃষ্ট মতিরহাটে ঘুরতে জেলা ও বাইরে থেকে অসংখ্য ভ্রমণপিপাসুর উপস্থিতি চোখে পড়ে। এখান থেকে চর শামছুদ্দিনে পৌঁছাতে লাগে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট। ফলে মতিরহাট মেঘনাতীরে ঘুরতে আসা বেশিরভাগ মানুষ চরের সৌন্দর্য দেখতে যান। মতিরহাট খেয়াঘাট থেকে চরে আসা-যাওয়ার খরচ জনপ্রতি মাত্র ৫০ টাকা।

দলবেঁধে গেলে রিজার্ভে ট্রলার ভাড়া নেয়া যায়। ওখানে এখনো কোনো মসজিদ-মাদ্রাসা কিংবা স্কুল গড়ে ওঠেনি। বিশুদ্ধ পানির জন্য নেই কোনো নলকূপ। নদী বা খালের পানির বিকল্প নেই বাসিন্দাদের। গ্রীষ্মকালে ওপার থেকে খাবারের জন্য পানি আনা হয়। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সুবিধাজনক নয়।

দুর্যোগ প্রতিরোধে এখনো গড়ে ওঠেনি সবুজবলয়। চরে মানুষ গরু, ছাগল ও মহিষ বর্গায় লালন-পালনসহ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকার সুবাদেও ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে চর শামছুদ্দিনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চরটিতে এমনকি চরের ওপারে মতিরহাটে এখনো থাকার মতো কোনো আবাসিক হোটেল গড়ে ওঠেনি। রাত্রী যাপনের জন্য অবশ্যই জেলা শহরকে বেছে নিতে হবে। জেলা শহরে উন্নত মানের বেশ কিছু গেস্টহাউস গড়ে উঠেছে। উন্নত মানের দুটি আবাসিক হোটেল রয়েছে।

বাগবাড়ির ঐতিহ্য কনভেশন ও স্টার গেস্টহাউস এবং চকবাজারের সোনার বাংলা আবাসিক রেস্টুরেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধা হাউস অন্যতম। সে ক্ষেত্রে খরচ আসবে এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। সকাল বা রাতের খাবারটা গেস্টহাউসেই সেরে নিতে পারবেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, দিনের বেলায় যেহেতু ভ্রমণে আসবেন।

যেহেতু মতিরহাটের মেঘনাতীরে তাজা ইলিশ ভোজনে দুপুরের খাবারও খেয়ে নিতে পারবেন। আর মহিষের খাঁটি দধির স্বাদটাও নিতে ভুলবেন না। চাইলে নদীতীরের ঘাট থেকে ইলিশ আর হোটেল বা দধির দোকান থেকে দধি নিয়ে আসতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, ইলিশ যেমন তাজা, দধিও তেমন খাঁটি।

রাজধানী ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সড়কপথে বাসে করে কিংবা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে লঞ্চে করে চাঁদপুর হয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার শহরের ঝুমুর স্টেশন, তারপর লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক সড়কের যেকোনো গাড়িতে তোরাবগঞ্জ নেমে সেখান থেকে মতিরহাট সড়ক দিয়ে মেঘনাপাড়ে পৌঁছান।

এরপর ট্রলার চেপে চর শামছুদ্দিনের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে হারাতে পারেন নিজেকে। লঞ্চে এলে খরচ পড়বে আসা-যাওয়া মোট ৯৪০ টাকা আর সড়কপথে বাসে করে এলে মোট আসা-যাওয়ার খরচ পড়বে এক হাজার ২০ টাকা।

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Cart
Your cart is currently empty.