ধূমকেতুবিডি

আলু চাষে লাভবান হবেন যেভাবে

আমাদের দেশে খাদ্য হিসাবে আলুর চাহিদা ব্যাপক। কিন্তু চাহিদার তুলনায় আলুর উৎপাদন খুবই কম। কারণ-সঠিক চাষাবাদের অভাব, কৃষক আলু উৎপাদন করে ন্যায্য মূল্য পায় না ইত্যাদি। আলুতে ভিটামিন সি ও বি পাওয়া যায়। আলু চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া হল

চাষের মৌসুম : উত্তরাঞ্চলে মধ্য-কার্তিক/ নভেম্বর প্রথম সপ্তাহ দক্ষিণাঞ্চলে অগ্রহায়ণ মাসের ১ম সপ্তাহ থেকে ২য় সপ্তাহে নভেম্বর মাসের মধ্য থেকে শেষ সপ্তাহ চাষাবাদ করার উপযুক্ত সময়।

উপযুক্ত জলবায়ু : আলু নিতান্তই শীতপ্রধান অঞ্চলের ফসল৷ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলেও আলু ভালো জন্মে৷ তবে অ-নিরক্ষীয় অঞ্চলের শীতকালীন মৌসুমে যেমন আমাদের দেশে আলুর চাষ করা চলে৷ ১৬-২১ ডিগ্রি তাপমাত্রা আলুর জন্য আদর্শ স্থানীয়, তবে গাছ বৃদ্ধির প্রথম দিকে অধিক তাপ ও শেষ দিকে অর্থাৎ কন্দ ধরা কালীন সময়ে কম তাপ থাকা বাঞ্ছনীয়।

মৌসুমে মাঝারি বৃষ্টিপাত ৩০ ইঞ্চি অর্থাৎ ৭৬২ মিলিমিটার আলুর জন্য উপযোগী। অধিক বৃষ্টিপাতে আলু মোটেই ভালো হয় না; গাছের বৃদ্ধি থেমে যায়। রোগ ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ সহজতর হয়৷ তবে পার্বত্য এলাকায় অধিক বৃষ্টিপাত হলেও পানি দ্রুত সরে যায় ও ঠাণ্ডা পরিবেশ বিরাজমান থাকে বলে সেরূপ পরিবেশে আলুর চাষ করা যায়৷ তাই পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলায় এইরূপ পরিবেশে গ্রীষ্মকালে আলু জন্মানো যায়।

মাটির ধরন : দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটি আলুর জন্য সব চাইতে উপযোগী। এটেল-দোআঁশ মাটিতেও আলুর চাষ করা যায়, তবে এই রকম মাটিতে আলু খুব একটা ভালো হয় না। আলুর মাটি সুনিষ্কাশনযুক্ত, গভীর ও কিছুটা অম্লাত্মক হওয়া চাই৷ PH ৫.৫-৬০ এর মধ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়, এতে আলুর জন্য ক্ষতিকর রোগ স্কেভিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

বীজ বপন পূর্বে করণীয় : বীজ প্রত্যয়িত হলে বপনের আগে আর কোনো রকম ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। অন্যথায় বীজ শোধন করে নেওয়া ভালো৷ বীজ শোধনের জন্য মারকিউরিক ক্লোরাইড (Mercuric chloride), ফার্মালডিহাইড অথবা, ইয়েলো অক্সাইড অব মার্কারি ব্যবহার করা যায়। উক্ত তরল গুলোতে আলুর বীজকে কিছুক্ষণ চুবিয়ে উঠিয়ে নিলেই বীজ শোধন হয়ে যায়।

বীজ বপন : বপনের জন্য আলুর টিউবার অর্থাৎ কন্দ ব্যবহার করা হয়৷ আগের বছরের সুরক্ষিত অঙ্কুরিত বীজ ব্যবহার করা হয়৷ আশ্বিনের মাঝামাঝি হতে অগ্রাহয়ণের মাঝামাঝি পর্যন্ত আলু লাগানো যেতে পারে৷ তবে আগাম ফসল করতে হলে ভাদ্র মাসের শেষে বীজ বপন করতে হবে৷

আলু বীজ সারিতে বপন করতে হয়৷ এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ৬০ সেন্টিমিটার রাখতে হবে, এবং সারিতে এক বীজ হতে অন্য বীজের দূরত্ব হবে ২৩-৩৮ সেন্টিমিটার৷ বীজ আস্ত বপন করাই ভালো, তবে আকারে বেশি বড় হলে কেটে দুইভাগ করে লাগান যায়।

যে বীজের ব্যাস ২ হতে ৩ সেন্টিমিটার সেই বীজই বপনের জন্য উত্তম এবং সেসব বপন বপন করার সময় কাটার প্রয়োজন হয় না৷ আর যেসব বীজের ব্যাস এক সেন্টিমিটারের চেয়ে বেশি সেগুলো কেটে লাগানো যেতে পারে৷ কেটে বপন করলে বীজের পরিমাণ কম লাগে অর্থাৎ আস্ত বীজ ব্যবহার করলে যদি এক প্রতি হেক্টরে ১৫০০ কেজি লাগে সেক্ষেত্রে কর্তিত বীজ ব্যবহার করলে এর অর্ধেক অর্থাৎ ৭৫০ কেজি বীজ লাগবে৷

সার প্রয়োগ পদ্ধতি:গোবর, অর্ধেক ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি, জিপসাম ও জিঙ্ক সালফেট রোপণের সময় জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে৷ বাকি ইউরিয়া রোপণের ৩০-৩৫ দিন পর অর্থাৎ দ্বিতীয় বার মাটি তোলার সময় প্রয়োগ করতে হবে৷ অম্লীয় বেলে মাটির জন্য ৮০-১০০ কেজি/হেক্টর ম্যাগনেসিয়াম সালফেট এবং বেলে মাটির জন্য বোরন ৮-১০ কেজি/হেক্টর প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়৷

সেচ ব্যবস্থাপনা : এদেশে অনেক চাষী  বিশেষ করে যারা দেশী আলুর চাষ করেন তারা আলুর জমিতে সেচের পানি ব্যবহার করতে চান না৷ কিন্তু অধিক ফলনশীল আলুর জাতে অধিক সার ব্যবহার করলে আলুর জমিতে পরিমাণ মতো পানি ব্যবহার করা আবশ্যক।

আলুর জমিতে সেচ দেওয়া বেশ সুবিধাজনক৷ সারিতে গাছের গোড়ায় মাটি উঁচু করে দেওয়ার ফলে যে জুলি বা নালার সৃষ্টি হয় তার মধ্যে পানি প্রবেশ করিয়ে দিলেই সারা ক্ষেত পানিতে সিক্ত হয়ে যায়। আলুর জমি সব সময় রসযুক্ত থাকবে সেই বিবেচনায় আলু ক্ষেতে নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে।

মাটির প্রকারভেদের উপর নির্ভর করে ২/৩ বার সেচ দিলেই চলবে৷ অধিক সেচে কোনো লাভ নেই, তাতে বরং উপকারের চাইতে অপকারই হবে। এই অবস্থায় গাছে ছোট ছোট নিম্নমানের আলু ধরবে৷ আবার অনিয়মিত পানি ব্যবহার করলে গুটি যুক্ত ফাঁপা ধরনের আলু জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে। আলু উঠানোর দুই সপ্তাহ পূর্ব হতে সেচ বন্ধ করে দিতে হবে। এতে আলুর পূর্ণতা প্রাপ্তি হবে।

আগাছা দমন : বীজ বপনের ৬০ দিন পর্যন্ত আলুর ক্ষেত আগাছা মুক্ত রাখতে হয়। আলুর জমিতে আগাছা দমন আলাদাভাবে করার প্রয়োজন পড়ে না। গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেয়া ও গোঁড়ার মাটি আলগা করে দেয়ার সময়ই আগাছা দমন হয়ে যায়।

পোকার আক্রমণ ও দমন  কাটুই পোকার কীড়া বেশ শক্তিশালী, ৪০-৫০ মিলিমিটার লম্বা হয়। পোকার উপর পিঠ কালচে বাদামি বর্ণের, পার্শ্বদেশ কালো রেখাযুক্ত এবং বর্ণ ধূসর সবুজ৷ শরীর নরম ও তৈলাক্ত। কাটুই পোকার কীড়া চারা গাছ কেটে দেয় এবং আলুতে ছিদ্র করে আলু ফসলের ক্ষতি করে থাকে। পোকার কীড়া দিনের বেলা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে৷ আলুর কাটা গাছ অনেক সময় কাটা গোঁড়ার পাশেই পড়ে থাকতে দেখা যায়।

গাছের গোড়ায় মাটি দেওয়া : আলু লাগানোর ৩০-৩৫ দিন পর গোড়ায় মাটি দেওয়া প্রয়োজন৷ জমিতে আলুর গাছ যখন ৫-৬ ইঞ্চি অর্থাৎ ১২-১৫ সেন্টিমিটার হয় তখন দুই সারির মাঝখানের মাটি হালকাভাবে কুপিয়ে নরম ঝুরঝুরা করে নিতে হয়৷ এই সময় জমির আগাছা নিধনের কাজও হয়ে যায়৷ নরম ঝুরঝুরা মাটি কোদালি দ্বারা টেনে সারিতে গাছের দুই দিকে দেওয়া হয়।

এর তিন সপ্তাহ পর গোড়ায় আবার মাটি দিতে হয়৷ গাছের বৃদ্ধি বেশি হলে আর একবার অর্থাৎ তৃতীয়বারের মতো মাটি দেওয়া হয়৷ গাছের গোড়ায় এইভাবে মাটি দিলে গাছের স্টোলনগুলো টিউবার অর্থাৎ আলুতে পরিণত হবার সুযোগ পায়৷ মাটি ঠিকমতো দেওয়া না হলে বর্ধিষ্ণু আলু মাটির বাইরে এসে সবুজ রং ধারণ করে৷ এ রকম আলু খাবার অনুপোযোগী এবং কখনো কখনো তা বিষাক্তও হতে পারে।

আলু সংগ্রহ : আলুর সারিতে কোদালের সাহয্যে বা লাঙল চালিয়ে আলু মাটি থেকে তোলা হয়৷ তবে আলু তোলার সময় সতর্ক থাকতে হবে যাতে আলু কেটে বা থেতলিয়ে না যায়, কেননা আলু থেতলিয়ে গেলে সংরক্ষণ করার সময় পচে যায়৷

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
error: Content is protected !!