ধূমকেতুবিডি

ধর্ম ‘দ্বীন’ এবং ‘রিলিজিয়ান’ এক কথা নয়!

বেনজীন খান

দ্বীন : আরবী ‘দ্বীন’ শব্দটিকে অনেকে বাংলা অনুবাদে ‘ধর্ম’ মনে করে কিন্তু তা ঠিক নয়।
দ্বীন, ‘আরবী’ √দা ইয়া না – د ي ن (root word) হতে উৎপন্ন একটি শব্দ যার অর্থ হলো– ‘শৃঙ্খলা’ (discipline)।
বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় ‘ব্যবস্থা’। আরও বিশদ অর্থে তা হবে– জীবন ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রব্যবস্থা। এখানে ‘ব্যবস্থা’ কোনো বস্তু নয় তবে ‘শব্দগত’ অস্তিত্ব।
ব্যবস্থা শব্দটি উচ্চারিত হওয়া মাত্রই আমাদের মানসপটে ভেসে উঠে– শৃঙ্খলা বা discipline। অর্থাৎ ব্যবস্থা মাত্রই শৃঙ্খলা। বরং শৃঙ্খলাহীনতা কোনো ব্যবস্থা নয়।
এখানে ‘শৃঙ্খলা’-ই হলো ব্যবস্থার ধর্ম, গুণ বা বৈশিষ্ট্য। আবার এই শৃঙ্খলারই পূর্বে যখন বিশেষ গুণ, বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম যুক্ত হয় তখন তা হয়ে ওঠে বিশেষ ধর্মীয় ব্যবস্থা যেমন:

~ দ্বীনুল ইসলাম বা ইসলামীক ব্যবস্থা,
~ কমিউনিস্টিক ব্যবস্থা বা সাম্যবাদ,
~ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা,
~ পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা,
~ একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা,
~ ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা, ইত্যাদি।

এই যে, ‘ইসলামিক’, ‘কমিউনিস্টিক, ‘গণতান্ত্রিক’, ‘পুঁজিতান্ত্রিক’, ‘একনায়কতান্ত্রিক’, ‘ফ্যাসিস্ট’, এসবই মূলতঃ অবস্তুগত অস্তিত্ব, গুণ বা বৈশিষ্ট্য; এককথায় ‘ধর্ম’।

ব্যবস্থা এখানে ‘একক’ থেকে ‘বিশেষ’-এ রূপান্তরিত হলো। অর্থাৎ ব্যবস্থা এখন বহুধা ভাগে বিভক্ত হয়ে বিশেষ বিশেষ ধর্ম বা গুণে হাজির-নাজির হলো। বলা যায়, প্রতিটি ব্যবস্থা-ই এখন একেকটি ধর্মীয় ব্যবস্থা। এবং প্রতিটি ব্যবস্থাই যে এখন একেঅপরের থেকে আলাদা সেটি ঐ ব্যবস্থার ধর্মেরই কারণে।

অর্থাৎ ‘দ্বীনুল ইসলাম’ মানে– এমন একটি দ্বীন যার ধর্ম ‘ইসলাম’ আত্মসমর্পণ বা প্রকৃতি বান্ধব জীবন প্রতিষ্ঠা করা। তদ্রুপ ‘কমিউনিস্টিক ব্যবস্থা’ মানে– এমন একটি দ্বীন যার ধর্ম শ্রেণীহীনতা বা সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। একই ভাবে ‘পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ মানে– এমন একটি দ্বীন যার ধর্ম পুঁজির কেন্দ্রীভবন মুনাফা বা উদ্বৃত্ত শোষণ, ইত্যাদি।

অপরদিকে দ্বীনুল ইসলামের সাথে অপরাপর ব্যবস্থা বা ধর্মের ধারণার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে যেমন, ইসলাম বাদে প্রতিটি ধর্ম বা ব্যবস্থাই হলো– শুধুই ‘রাষ্ট্রব্যবস্থা’; অথবা আর একটু এগিয়ে ‘সমাজ ব্যবস্থা’। কিন্তু ইসলাম সেক্ষেত্রে আরও একটু বেশি এগিয়ে; সেটি হলো– ‘ইসলাম’ রাষ্ট্র এবং সমাজের সাথে সাথে ব্যক্তি মানুষেরও জীবন ব্যবস্থা। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষই আত্মসমর্পণ করবে আর ভরসা করবে প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলার মধ্যেই মানুষের মুক্তি।

আরবী পরিভাষায় দ্বীনের আরও অনেক অর্থ আছে যেমন:
* দ্বীন শব্দের অর্থ– ঋণ বা দেনা।
* আরেকটি অর্থ– বিচার দিবস।
* আরেকটি অর্থ– এমন বৃষ্টি যা বার বার ফিরে এসে পৃথিবীকে জীবন দেয়।
* বিশেষত: দ্বীন বলতে বুঝায়– ব্যক্তি মানুষ, রাষ্ট্র বা সমাজ যে মৌলিক নিয়মনীতির উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেয়; অথবা যে শাসক যে সংবিধান অনুসরণ করে তার দেশ চালায় অথবা কোনো সমাজ যে রীতি মেনে চলে বা চালিত হয় সেটাই তার দ্বীন।

এককথায় আরবী ‘দ্বীন’-র সঠিক অনুবাদ হবে– জীবন পরিচালনার মূলনীতি বা ব্যবস্থা (System of Life)। কোনো ভাবেই আরবী ‘দ্বীন’ অর্থ ‘ধর্ম’ নয়।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
error: Content is protected !!