ধূমকেতুবিডি

জঙ্গলের নাম ফেরদৌস

বেনজীন খান

বলছিলাম, একটি জঙ্গলের কথা। যে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছিলো একটি নদী। নদীটিতে ছিলো স্বচ্ছ পানির ধারা। সেখানে ছিলো মাছ আর প্রাণের মেলা। ছিলো গাড়ো সবুজের সমাহার। আর ছিলো ভরপুর আলো ও তার প্রতিবেশী– নিবিড় ছায়া। গতিময় বাতাসের প্রবাহ, আন্দোলিত ফুল, সুবাসের নৃত্য, ফলের প্রাচুর্য, পাখি পশু আর কীট-পতঙ্গের গানে জঙ্গলটি ছিলো ঠিক যেনো– জান্নাতুল ফেরদৌস।

এ-জঙ্গলের জন্ম ইতিহাস বেশ পুরনো। ভূগোল মতে হিমালয় সৃষ্টির কিছুদিন পরের কথা। পুনরায় শোধরানো হবে শর্তে অতি মায়াবতী পাহাড়– মেঘ থেকে পানি ধার করে দিতে থাকে উষর ভূমিতে। সেই থেকে শুরু জঙ্গলের যাত্রা।

এত এত নিয়ামত ছিলো এখানে যে, ভিনদেশী পশুরা এসে কেউই আর ফেরেনি আপন দেশে। জঙ্গলটি তাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো পুরো জগত; বৈচিত্র্যের সমাহার! এভাবেই চলে এসেছে জঙ্গলটির দীর্ঘ অজানা কালের ইতিহাস।

প্রেম মায়া আর সমতার ভিত্তিতে জঙ্গলটিতে সবুজ অরণ্য আর পশুতে চলত অপার লীলে। কীটপতঙ্গ আর অনুজীবগুলোও সেই লীলে উপভোগ করতো নৃত্যের তালে তালে। এ-স্বর্গীয় পরিচয় তাই গুপ্ত থাকেনি হিমালয়ের দক্ষিণ পাদদেশে। বরং তা পৌঁছে যায় গোলোকের একের পর এক প্রান্ত অবধি।

সেও আজকের কথা নয়!

একদা কোনো এক প্রত্যুশে খেয়াল করলো জঙ্গল অধিবাসী– উত্তর পশ্চিম পাহাড়ের গা-ঘেঁষে অপরিচিত পশুকুলের একটি ধারার নিয়মিত আনাগোনা। নিরীহ জঙ্গলবাসী প্রথম প্রথম ভেবেছিলো– হয়তো ওপারে মোড়ক লেগেছে, দেখা দিয়েছে যারপরনাই খাদ্যের অভাব।

প্রাচুর্যে ভরপুর আদিবাসীগণ– সুন্দরী গাছ, গোলপাতা, সঙ্ঘবদ্ধ বাঁশ; ফজলি আম, লেবু, পেয়ারা; ছোলা, মুসুড়ি, ধান; জবা, হাসনাহেনা, বেলি। গরু, মহিষ, বাঘ, হনুমান, বানর, হরিণ, খরগোশ। কেঁচো, ব্যাঙ, কচ্ছপ, শামুক। ঝিয়া, মায়া, খলিসা, ইলিশ। ঘুঘু, পেঁচা, দোয়েল, কোকিল আর ময়ূর কেউ-ই ভাবেনি কখনো, এই আগন্তুকদের থাকতে পারে কোনো গোপন অভিসার! তারা বেঘোরে নিমগ্ন ছিলো তাদের জান্নাতুল ফেরদৌসে।

কিন্তু নিরীহ হরিণ একদিন খেয়াল করলো– বানরেরা আর গাছের পাতা ফেলে না। ফেউ সতর্ক করে না বাঘের আগমন। শামুক নিজেকে খোলসে গুটিয়ে ফেলেছে। ময়ূর তার পেখম মেলছে না। কেঁচো মাটিকে উলটপালট করছেনা, অণুজীবরা ঘুমিয়ে গেছে। সবুজ বন দুলছে না। বাতাস থমকে গেছে। মেঘ মলিন, পানির ধারা দিতে গররাজি। হাসনাহেনা কামিনী গন্ধ বন্ধ রেখেছে। গুমোট আবহাওয়ায় নাভিশ্বাস সকলের। তাদের জঙ্গলে এখন প্রবাহিত হচ্ছে ঘৃণা আর বিদ্বেষ!

এমতাবস্তায় পূর্বতন প্রাচুর্যের গৌরবগাঁথা বিস্তারের ন্যায় আজও নিরীহ হরিণ আর ঘুঘু পাখির দীর্ঘশ্বাস পৌঁছে গেলো গোলকের নানা প্রান্ত পর্যন্ত।

অবশেষে জঙ্গলদেশে নেমে এলো সুফল-কুফল দুই-ই। প্রবেশ করতে থাকলো নানা রঙের তস্কর-ত্রাতা। জঙ্গলদেশ হারিয়ে ফেললো তার সম্পূর্ণ নিজস্বতা। আপন দেশে এখন ভূমিপুত্র পরবাসী। এখন সেখানে নিয়মিত যুদ্ধ ঝরে; প্রবাসী পশুকুলের মধ্যে যুদ্ধ। আর ভূমিপুত্রকে হতে হয়– পক্ষ।

এক সময় যুদ্ধের দামামায় জঙ্গল তামা হয়ে যায়। ঝরে যায় শান্ত সবুজ। অন্ধকার ছায়াও সরে যায়। হারিয়ে যায় জোনাকি আলো। মায়াবতী প্রেম কবরে লুকাই। কেবল জেগে থাকে উজ্জ্বল– চিতা।

ফাটল ধরে জঙ্গলে, মাটিতে, মন আর মননে। আর ফাটলের গোহীন থেকে উদগীরণ হতে থাকে দু’টি অন্ধকার রে– চক্র ও চাঁদ। পশুকূল ভেবেছিলো হয়তো এবার থীতো হবে জঙ্গল। কিন্তু কিছু দিন বাদেই দেখা গেলো চক্রের ধাক্কায় ফাটল ধরলো চাঁদে, আর সেই অবসরে চাঁদ চিরে বের হয়ে এলো– সূর্য। জঙ্গল-ফেরদৌস এখন হয়ে গেলো তিনটি ভাগে বিভক্ত– চক্র, চাঁদ ও সূর্যে; প্রকারান্তরে যা হয়ে উঠলো একেকটি নরক, যথাক্রমে: তমিস্রা—রৌরব—কালসূত্র।

প্রতিটি জঙ্গলেই এখন অবৈধ মিলনে মিলনে ভরপুর জন্ম নিয়েছে– দাঁতাল শুয়োর, কুৎসিত হায়েনা, ধেড়ে ইঁদুর, বিষধর সাপ আর সুযোগ সন্ধানী শকুন। তাদের দাপাদাপিতে থরহরিকম্প জঙ্গলময়। খেয়েই চলেছে উপর-নিচে সর্বত্র। ফলবতী বৃক্ষগুলো মুড়ো হয়ে গেছে। দাঁতাল শূয়োরের খোড়াখুড়িতে গোড়ার মাটি সরে গিয়ে শিকড়সুদ্ধ উলুঙ্গ এখন। তারা আকাশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে সবুজের প্রাচীর। সূর্যের বিষাক্ত আগুনকে করেছে আলিঙ্গন। তাতেই ছারখার হয়েছে জঙ্গলের আদি বাসিন্দা সমূহ– কীটপতঙ্গ, ব্যাকটেরিয়া, অণুজীব। বিরাগভাজন মেঘ। শর্ত ভঙ্গে অনুতপ্ত পাহাড়। ফিরে গেছে জলের ধারা।

অতঃপর একদিন প্রতিশোধে প্রকৃতি, ঈশানকোণে পাঠিয়ে দিলো কালো মেঘ। মেঘ বয়ে আনলো বাতাস। সে বাতাসে মাটি ছেড়ে উলঙ্গ ছিন্নভিন্ন শীকড় সহ কান্ড সমূহ গেলো উপড়ে। দেখা গেলো, অতিশয় বিশাল কাণ্ডের তলে চাপা পড়ে মরে অতিকায় দাঁতাল শুয়োর, কুৎসিত হায়েনা, ধেড়ে ইঁদুর, বিষাক্ত সাপ। আর তৎক্ষনাতই পালে পালে এসে গেলো কুৎসিত শকুন। মুহূর্তে শুরু হলো– ভোগের বিকার উল্লাস।

মহাপ্রলয় শেষে কিছুদিন সুনসান নীরবতা। মৃত শ্মশান পুরীতে দেখা গেলো, ক্ষুদ্ররা বেঁচে আছে অতিকায় গুড়ির ছোট ছোট ফাঁকফোকরে। ধীরে ধীরে তারা বের হতে লাগলো। পালিয়ে যাওয়া মায়াবী হরীণ এসে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! হঠাৎই সে শুনতে পেলো পেছনে তার খসখস শব্দ। তাকিয়ে দেখে– নিরীহ খরগোশ। বললো, শ্মশান পুরের দক্ষিণে দেখে এলাম, পঁচা-সার ভেদ কোরে পাপড়ি মেলছে– রসুন ফুলের গোলাপি কুঁড়ি।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
error: Content is protected !!